আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন- সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো
আন্দোলন প্রতিবেদন
মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১ | অনলাইন সংস্করণ
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে “পরিবেশ সম্মেলন”টি বিশ্ব-নেতাদের (সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের পোঁ ধরা নেতাদের) নামে হলেও সেটা প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের করায়ত্বে। এটা বোঝা গেল যখন তাদের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়া তাতে লোকদেখানো অংশ নিলেও তাদের প্রধান নেতা যথাক্রমে শি ও পুতিন অংশ নেয়নি। এইসব নেতারা (যার মাঝে “আমাদের”শেখ হাসিনাও রয়েছেন) বহু বহু সুন্দর সুন্দর প্রস্তাব নিয়েছেন, মহাবিতর্ক করেছেন, একে অন্যকে দায়ী করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কী হবে সেটা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ ছিল। শেষ দিকে বিশ্ব পরিবেশ ধ্বংসের প্রধান দুই নায়ক আমেরিকা ও চীন একটি যুক্ত চুক্তি করেছে, যাকে খুব বড় প্রচার দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়া। কিন্তু যদি বলা হয় যে, অতীত দেখে বর্তমান বলো, তাহলে বলতে হবে যে, যেমনটা চলছে তার খুব কমই পরিবর্তন হবে, এমনকি কিছুই হয়তো হবে না।
যারা ততটা অবগত নন তাদের জন্য বলা যায় যে, এটা হলো বিশ্ব-নেতাদের এ জাতীয় ২৬তম সম্মেলন- কপ ২৬। ‘কপ’ মানে হলো “পার্টিগুলোর সম্মেলন”। এমন সম্মেলনগুলো হচ্ছে বিশ্ব-জলবায়ুর গুরুতর ক্ষতি হয়ে যাবার পর বিশেষত উন্নত দেশের পরিবেশ কর্মীদের চাপে। যাতে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ুর এক ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে গেছে, আগামীতে আরো হতে চলেছে। তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে মেরুপ্রদেশ ও পর্বতশৃঙ্গের বরফ আশঙ্কাজনকভাবে গলে যাচ্ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বিরাটভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, ফলে বিশ্বের নিম্নাঞ্চলগুলো সমুদ্রের লোনা পানিতে ডুবে যাবে, বহু মানুষ তাতে বাস্তুচ্যুত হবেন- যার মাঝে বাংলাদেশও অন্যতম। লোনা পানিতে ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আবাদী জমির ফসল উৎপাদেন বড় ধরেনর ক্ষতি হবে, প্রাণ-বৈচিত্র্যের বিরাট ক্ষতি হবে। এসবই বিশ্বকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে। কেউ কেউ মানব-জাতির ধ্বংসের আলামতও দেখছেন।
কিন্তু তাপমাত্রা যে বাড়ছে সেটা কোনো প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের পদলেহী শাসক শ্রেণির মুনাফালোভী অবিমৃশ্যকারী কর্মসূচিগুলোর কারণে। যার প্রধানতম বিষয়টি হচ্ছে বাতাসে কার্বনের দূষণ। এটা হচ্ছে কয়লা, তেল, গ্যাস- ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে। বিশেষত কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুত উৎপাদেনর সর্বনাশা ও বিপুল কার্যক্রমের জন্য।
তাই, বিশ্ব-বুর্জোয়া নেতারা এখন বাধ্য হয়ে কার্বন নিঃসরণ কীভাবে কমানো যায় তার জন্য বুকডন দেয়া শুরু করেছেন।
কিন্তু উন্নয়ন ও উৎপাদনকে অব্যাহত রেখে কি কার্বন নিঃসরণ কমানো যায় না? নিশ্চয়ই যায়। কিন্তু সেজন্য একদিকে প্রয়োজন কার্বন নিঃসরণ কমানো, অন্যদিকে প্রয়োজন নিঃসৃত কার্বনকে শুষে নেবার জন্য বিপুল বনাঞ্চল গড়ে তোলা, এক কথায় গাছ লাগানো। সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল বুর্জোয়ারা করছে তার বিপরীত কাজ। তারা বিরাটভাবে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। তারা বিশ্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলগুলোকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। এর উৎস হিসেবে রয়েছে তাদের বিপুল মুনাফা অর্জনের লিপ্সা। অথচ তারাই পরিবেশ রক্ষার বড় বড় কাগুজে নসিহত করছে। আর নিজেরাই সেগুলো লংঘন করছে।
বর্তমান সম্মেলনের আগেরটিতে তারা পরিবেশ রক্ষার যে অঙ্গীকারগুলো করেছিল সেগুলো তারা বাস্তবায়ন তো করেই নি, বরং তাপমাত্রা আগের চেয়ে বাড়িয়েছে। তাই বিরাট সংখ্যক পরিবেশ আন্দোলনকারী তাদেরকে আর বিশ্বাস করছেন না। এই (সাম্রাজ্যবাদী ও বুর্জোয়া) নেতারা যে মিথ্যা কথা বলছে, তাদেরকে যে বিশ্বাস করা যায় নাÑ এগুলো প্রকাশ্যে বলা হয়েছে সম্মেলন-শহরে আগত বিপুল পরিবেশ কর্মীদের থেকে।
* ‘আমাদের’প্রধানমন্ত্রীও সেখানে গিয়ে একইভাবে বড় ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু দিনশেষে বন-উজাড় বন্ধ করার যে চুক্তি হয়েছে, তাতে তিনি স্বাক্ষর পর্যন্ত করেননি (১২৪টি অনুন্নত দেশের অধিকাংশই তাতে স্বাক্ষর করেছে)। তারা একদিকে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্র বিরোধী বক্তব্য রেখে বাজার মাত করে দিচ্ছেন। অথচ কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্র রামপালকে ভারতের দালালীর কারণে বন্ধ করতে অস্বীকার করছেন।
আমাদের দেশে বনাঞ্চল ধ্বংস, নদী-খাল-জলাশয় ধ্বংস ও দূষণ, বায়ু-দূষণ প্রভৃতির জন্য দায়ী সমস্ত কর্মসূচিই হাসিনা সরকার করে চলেছে। ঢাকা শহরের বাতাস পৃথিবীর সর্বোচ্চ দূষণের তালিকায় অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। শহরের খালগুলো তারা খেয়ে ফেলেছে বহু আগেই। নদীগুলোকেও বিবিধভাবে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চলছে। ঢাকা শহরের চারদিক ঘিরে রয়েছে সবচেয়ে বায়ু-দূষণকারী ইটভাটাগুলো, যেগুলোর মালিকানা নিরঙ্কুশভাবে আওয়ামী নেতাদের। প্লাস্টিকে ছেয়ে গেছে সারা দেশের মাটি ও নদী-নালা, এমনকি সমুদ্রও। ‘সেজ’- এর মাধ্যমে সারা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদীদের পরিবেশ দূষণকারী শিল্প সৃষ্টির এক অভয়ারণ্য বানানো হচ্ছে বাংলাদেশকে হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে।
এটা সত্য যে, বিশ্ব জলবায়ু ধ্বংসের কাজে সাম্রাজ্যবাদীরাই শীর্ষে। বিশেষত চীন, আমেরিকা, ব্রিটেন- এগুলো। কিন্তু তাদেরই সাঙ্গ পাঙ্গ হিসেবে আমাদের মতো দেশের শাসকশ্রেণিও কম যাচ্ছে না। ভারত একটি শীর্ষ দূষণকারী রাষ্ট্র।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মত নেতারা সেখানে গেছে ধনী দেশগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ নামে ভিক্ষা পাবার আশায়, যার থেকে তারা বড় অঙ্কের চুরির আশা করছে। এটা ঠিক যে, সাম্রাজ্যবাদীদের উপর এ চাপ অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। কিন্তু দেখা গেছে যে, পরিবেশ সম্মেলনের নেতা হিসেবে তারা ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দিতে গড়িমসি করছে। অন্যদিকে অনুন্নত দেশগুলোর শাসকরাও যে একই পলিসিকে তাদের দেশে চালাচ্ছে তাকে না দেখা তাদের অপরাধকে আড়াল করারই সামিল।
বড় দেশগুলোর কেউ কেউ ‘ওয়াদা’করছে ২০৫০ সাল, কেউবা ২০৭০ সালÑ এমন সময়ের মধ্যে তারা কয়লা-ভিত্তিক প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেবে। সে তো বহু দূর। ততদিনে তাপমাত্রা বেড়ে পৃথিবীর যা সর্বনাশ হবার হয়ে যাবে।
সেকারণেই পরিবেশ আন্দোলনকারীরা গ্লাসগো শহরকে লোকারণ্য করে তুলেছিল। তাদের দাবি ও আন্দোলন ন্যায্য নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের অনেকেই জানেন না যে, এই পরিবেশ-শত্রুদের কাছে দাবি করে সত্যিকার বা মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে যতটা সম্ভব চাপ রাখা যায়, হোক। কিন্তু আসল প্রয়োজন হলো- এ বিশ্বকে বাঁচাতে হলে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থাটিকেই উচ্ছেদ করতে হবে। কারণ, এই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের মুনাফার রাস্তা থেকে কখনোই সরে যাবে না।
পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ কমানো একমাত্র কর্তব্য নয়। কিন্তু সেগুলো এ সম্মেলনে আলোচনায় সেভাবে উঠে আসেনি। কারণ এসব-কিছু তারাই করে চলেছে।
বিশ্ব-জুড়ে সাম্রাজ্যবাদের মদদে ও কামড়াকামড়িতে যুদ্ধের দামামাও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ বৈ কি। বনাঞ্চল ধ্বংস করার মাধ্যমে তারা যে বিপুল মুনাফা লুটেছে তার হিসেব কে করবে? সাম্রাজ্যবাদী তথাকথিত উন্নয়ন, বিরাট নগরায়ন, নদীর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ-বাঁধ নির্মাণ, প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। সবই এ পৃথিবীর পানি, মাটি, বায়ু ও তাপমাত্রাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মুনাফার জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নতুন বিপদ। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সাধ্য নেই এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে আসা। তাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ রাখার উপায় একটাই- সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের উচ্ছেদ এবং মুনাফাবাজীর অবসানকারী সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সেজন্যই সৎ ও বিবেকবান সকল মানুষকে সংগ্রাম করে যেতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন- সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে “পরিবেশ সম্মেলন”টি বিশ্ব-নেতাদের (সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের পোঁ ধরা নেতাদের) নামে হলেও সেটা প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের করায়ত্বে। এটা বোঝা গেল যখন তাদের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়া তাতে লোকদেখানো অংশ নিলেও তাদের প্রধান নেতা যথাক্রমে শি ও পুতিন অংশ নেয়নি। এইসব নেতারা (যার মাঝে “আমাদের”শেখ হাসিনাও রয়েছেন) বহু বহু সুন্দর সুন্দর প্রস্তাব নিয়েছেন, মহাবিতর্ক করেছেন, একে অন্যকে দায়ী করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কী হবে সেটা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ ছিল। শেষ দিকে বিশ্ব পরিবেশ ধ্বংসের প্রধান দুই নায়ক আমেরিকা ও চীন একটি যুক্ত চুক্তি করেছে, যাকে খুব বড় প্রচার দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়া। কিন্তু যদি বলা হয় যে, অতীত দেখে বর্তমান বলো, তাহলে বলতে হবে যে, যেমনটা চলছে তার খুব কমই পরিবর্তন হবে, এমনকি কিছুই হয়তো হবে না।
যারা ততটা অবগত নন তাদের জন্য বলা যায় যে, এটা হলো বিশ্ব-নেতাদের এ জাতীয় ২৬তম সম্মেলন- কপ ২৬। ‘কপ’ মানে হলো “পার্টিগুলোর সম্মেলন”। এমন সম্মেলনগুলো হচ্ছে বিশ্ব-জলবায়ুর গুরুতর ক্ষতি হয়ে যাবার পর বিশেষত উন্নত দেশের পরিবেশ কর্মীদের চাপে। যাতে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ুর এক ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে গেছে, আগামীতে আরো হতে চলেছে। তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে মেরুপ্রদেশ ও পর্বতশৃঙ্গের বরফ আশঙ্কাজনকভাবে গলে যাচ্ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বিরাটভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, ফলে বিশ্বের নিম্নাঞ্চলগুলো সমুদ্রের লোনা পানিতে ডুবে যাবে, বহু মানুষ তাতে বাস্তুচ্যুত হবেন- যার মাঝে বাংলাদেশও অন্যতম। লোনা পানিতে ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আবাদী জমির ফসল উৎপাদেন বড় ধরেনর ক্ষতি হবে, প্রাণ-বৈচিত্র্যের বিরাট ক্ষতি হবে। এসবই বিশ্বকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে। কেউ কেউ মানব-জাতির ধ্বংসের আলামতও দেখছেন।
কিন্তু তাপমাত্রা যে বাড়ছে সেটা কোনো প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের পদলেহী শাসক শ্রেণির মুনাফালোভী অবিমৃশ্যকারী কর্মসূচিগুলোর কারণে। যার প্রধানতম বিষয়টি হচ্ছে বাতাসে কার্বনের দূষণ। এটা হচ্ছে কয়লা, তেল, গ্যাস- ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে। বিশেষত কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুত উৎপাদেনর সর্বনাশা ও বিপুল কার্যক্রমের জন্য।
তাই, বিশ্ব-বুর্জোয়া নেতারা এখন বাধ্য হয়ে কার্বন নিঃসরণ কীভাবে কমানো যায় তার জন্য বুকডন দেয়া শুরু করেছেন।
কিন্তু উন্নয়ন ও উৎপাদনকে অব্যাহত রেখে কি কার্বন নিঃসরণ কমানো যায় না? নিশ্চয়ই যায়। কিন্তু সেজন্য একদিকে প্রয়োজন কার্বন নিঃসরণ কমানো, অন্যদিকে প্রয়োজন নিঃসৃত কার্বনকে শুষে নেবার জন্য বিপুল বনাঞ্চল গড়ে তোলা, এক কথায় গাছ লাগানো। সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল বুর্জোয়ারা করছে তার বিপরীত কাজ। তারা বিরাটভাবে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। তারা বিশ্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলগুলোকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। এর উৎস হিসেবে রয়েছে তাদের বিপুল মুনাফা অর্জনের লিপ্সা। অথচ তারাই পরিবেশ রক্ষার বড় বড় কাগুজে নসিহত করছে। আর নিজেরাই সেগুলো লংঘন করছে।
বর্তমান সম্মেলনের আগেরটিতে তারা পরিবেশ রক্ষার যে অঙ্গীকারগুলো করেছিল সেগুলো তারা বাস্তবায়ন তো করেই নি, বরং তাপমাত্রা আগের চেয়ে বাড়িয়েছে। তাই বিরাট সংখ্যক পরিবেশ আন্দোলনকারী তাদেরকে আর বিশ্বাস করছেন না। এই (সাম্রাজ্যবাদী ও বুর্জোয়া) নেতারা যে মিথ্যা কথা বলছে, তাদেরকে যে বিশ্বাস করা যায় নাÑ এগুলো প্রকাশ্যে বলা হয়েছে সম্মেলন-শহরে আগত বিপুল পরিবেশ কর্মীদের থেকে।
* ‘আমাদের’প্রধানমন্ত্রীও সেখানে গিয়ে একইভাবে বড় ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু দিনশেষে বন-উজাড় বন্ধ করার যে চুক্তি হয়েছে, তাতে তিনি স্বাক্ষর পর্যন্ত করেননি (১২৪টি অনুন্নত দেশের অধিকাংশই তাতে স্বাক্ষর করেছে)। তারা একদিকে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্র বিরোধী বক্তব্য রেখে বাজার মাত করে দিচ্ছেন। অথচ কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্র রামপালকে ভারতের দালালীর কারণে বন্ধ করতে অস্বীকার করছেন।
আমাদের দেশে বনাঞ্চল ধ্বংস, নদী-খাল-জলাশয় ধ্বংস ও দূষণ, বায়ু-দূষণ প্রভৃতির জন্য দায়ী সমস্ত কর্মসূচিই হাসিনা সরকার করে চলেছে। ঢাকা শহরের বাতাস পৃথিবীর সর্বোচ্চ দূষণের তালিকায় অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। শহরের খালগুলো তারা খেয়ে ফেলেছে বহু আগেই। নদীগুলোকেও বিবিধভাবে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চলছে। ঢাকা শহরের চারদিক ঘিরে রয়েছে সবচেয়ে বায়ু-দূষণকারী ইটভাটাগুলো, যেগুলোর মালিকানা নিরঙ্কুশভাবে আওয়ামী নেতাদের। প্লাস্টিকে ছেয়ে গেছে সারা দেশের মাটি ও নদী-নালা, এমনকি সমুদ্রও। ‘সেজ’- এর মাধ্যমে সারা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদীদের পরিবেশ দূষণকারী শিল্প সৃষ্টির এক অভয়ারণ্য বানানো হচ্ছে বাংলাদেশকে হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে।
এটা সত্য যে, বিশ্ব জলবায়ু ধ্বংসের কাজে সাম্রাজ্যবাদীরাই শীর্ষে। বিশেষত চীন, আমেরিকা, ব্রিটেন- এগুলো। কিন্তু তাদেরই সাঙ্গ পাঙ্গ হিসেবে আমাদের মতো দেশের শাসকশ্রেণিও কম যাচ্ছে না। ভারত একটি শীর্ষ দূষণকারী রাষ্ট্র।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মত নেতারা সেখানে গেছে ধনী দেশগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ নামে ভিক্ষা পাবার আশায়, যার থেকে তারা বড় অঙ্কের চুরির আশা করছে। এটা ঠিক যে, সাম্রাজ্যবাদীদের উপর এ চাপ অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। কিন্তু দেখা গেছে যে, পরিবেশ সম্মেলনের নেতা হিসেবে তারা ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দিতে গড়িমসি করছে। অন্যদিকে অনুন্নত দেশগুলোর শাসকরাও যে একই পলিসিকে তাদের দেশে চালাচ্ছে তাকে না দেখা তাদের অপরাধকে আড়াল করারই সামিল।
বড় দেশগুলোর কেউ কেউ ‘ওয়াদা’করছে ২০৫০ সাল, কেউবা ২০৭০ সালÑ এমন সময়ের মধ্যে তারা কয়লা-ভিত্তিক প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেবে। সে তো বহু দূর। ততদিনে তাপমাত্রা বেড়ে পৃথিবীর যা সর্বনাশ হবার হয়ে যাবে।
সেকারণেই পরিবেশ আন্দোলনকারীরা গ্লাসগো শহরকে লোকারণ্য করে তুলেছিল। তাদের দাবি ও আন্দোলন ন্যায্য নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের অনেকেই জানেন না যে, এই পরিবেশ-শত্রুদের কাছে দাবি করে সত্যিকার বা মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে যতটা সম্ভব চাপ রাখা যায়, হোক। কিন্তু আসল প্রয়োজন হলো- এ বিশ্বকে বাঁচাতে হলে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থাটিকেই উচ্ছেদ করতে হবে। কারণ, এই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের মুনাফার রাস্তা থেকে কখনোই সরে যাবে না।
পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ কমানো একমাত্র কর্তব্য নয়। কিন্তু সেগুলো এ সম্মেলনে আলোচনায় সেভাবে উঠে আসেনি। কারণ এসব-কিছু তারাই করে চলেছে।
বিশ্ব-জুড়ে সাম্রাজ্যবাদের মদদে ও কামড়াকামড়িতে যুদ্ধের দামামাও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ বৈ কি। বনাঞ্চল ধ্বংস করার মাধ্যমে তারা যে বিপুল মুনাফা লুটেছে তার হিসেব কে করবে? সাম্রাজ্যবাদী তথাকথিত উন্নয়ন, বিরাট নগরায়ন, নদীর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ-বাঁধ নির্মাণ, প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। সবই এ পৃথিবীর পানি, মাটি, বায়ু ও তাপমাত্রাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মুনাফার জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নতুন বিপদ। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সাধ্য নেই এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে আসা। তাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ রাখার উপায় একটাই- সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের উচ্ছেদ এবং মুনাফাবাজীর অবসানকারী সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সেজন্যই সৎ ও বিবেকবান সকল মানুষকে সংগ্রাম করে যেতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র